কৃষি

মাছের কারখানা: অ্যাকুয়াকালচারের আড়ালে প্রাণিকল্যাণের নীরব সংকট

জলজ খামারের অন্ধকার দিক এবং টেকসই উদ্ভিদ-ভিত্তিক সমাধানের সন্ধানে একটি অনুসন্ধানমূলক প্রতিবেদন।

4 মিনিট পড়া
মাছের কারখানা: অ্যাকুয়াকালচারের আড়ালে প্রাণিকল্যাণের নীরব সংকট
২০ মিলিয়ন টন
বন্য মাছের ব্যবহার
প্রতি বছর কেবল চাষের মাছের খাবার বানাতে সমুদ্র থেকে এই পরিমাণ বন্য মাছ ধরা হয়।
৫৮টি স্নায়বীয় কেন্দ্র
ব্যথা সংগ্রাহক
মাছের মাথায় অন্তত ৫৮টি সুনির্দিষ্ট পয়েন্ট রয়েছে যা আঘাতজনিত ব্যথার সংকেত মস্তিষ্কে পাঠায়।
৭০০ গ্যালন
পানির অপচয়
মাত্র এক পাউন্ড চিংড়ি চাষে গড়ে ৭০০ গ্যালন সুপেয় পানি ব্যবহৃত হতে পারে।

ভোরবেলা সাতক্ষীরার কোনো একটি ঘেরের পাড়ে দাঁড়ালে শান্ত জলের উপরিভাগ দেখে বোঝার উপায় নেই, নিচে কী এক নিরন্তর যুদ্ধ চলছে। আপাতদৃষ্টিতে মাছ চাষকে ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার প্রোটিনের চাহিদা মেটানোর এক জাদুকরী সমাধান মনে হলেও, এর নেপথ্যে রয়েছে পরিবেশগত বিপর্যয় এবং কোটি কোটি প্রাণীর অবর্ণনীয় যন্ত্রণা। আমরা যখন মুরগি বা গরুর 'ফ্যাক্টরি ফার্মিং' নিয়ে কথা বলি, তখন জলজ প্রাণীরা প্রায়ই আমাদের আলোচনার বাইরে থেকে যায়। অথচ একটি আধুনিক মাছের খামার বা অ্যাকুয়াকালচার প্রজেক্ট আসলে জলের তলদেশের এক জনাকীর্ণ কারাগার ছাড়া আর কিছুই নয়।

In brief, The State of World Fisheries and Aquaculture, 2018 In brief, The State of World Fisheries and Aquaculture, 2018 — Wikimedia Commons · Food and Agriculture Organization of the United Nations (FAO) · CC BY-SA 3.0 igo

নীরব চিৎকার: মাছ কি ব্যথা অনুভব করে?

দীর্ঘদিন ধরে একটি ভুল ধারণা প্রচলিত ছিল যে, মাছের স্নায়ুতন্ত্র উন্নত নয় এবং তারা ব্যথা পায় না। কিন্তু আধুনিক বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। এডিনবরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডঃ ভিক্টোরিয়া ব্রেথওয়েটের গবেষণা প্রমাণ করেছে যে, মাছের মুখে এবং মাথায় প্রচুর পরিমাণ সংবেদনশীল নোসিসেপ্টর (Nociceptors) থাকে, যা তাদের ব্যথার অনুভূতি বুঝতে সাহায্য করে।

অ্যাকুয়াকালচার ঘেরগুলোতে অত্যন্ত ঘনবসতিপূর্ণ অবস্থায় মাছ রাখা হয়। এই গাদাগাদি পরিবেশে মাছের প্রাকৃতিক চলাচলের স্বাধীনতা থাকে না, যা তাদের মানসিক স্ট্রেস বাড়িয়ে দেয়।

"আমরা যদি স্থলের প্রাণীদের এমনভাবে খাঁচাবন্দি করে রাখতাম, তবে তা বিশ্বজুড়ে ধিক্কার পেত। অথচ জলের নিচে মাছের সেই একই রকমের কষ্ট আমাদের চোখের আড়ালে থেকে যাচ্ছে।"

মাছ চাষে অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার (প্রতি টন প্রোটিন অনুযায়ী)(গ্রাম/টন)

কৃত্রিম ফিড এবং মহাসাগরের বাস্তুসংস্থান ধ্বংস

একটি বড় ভ্রান্তি হলো, মাছ চাষ করলেই হয়তো সমুদ্রের মাছ রক্ষা পাবে। বাস্তবে এর উল্টোটা ঘটছে। চাষের মাছকে খাওয়ানোর জন্য প্রতি বছর কোটি কোটি টনের 'ফিড ফিশ' (যেমন সার্ডিন বা অ্যাঙ্কোভি) সমুদ্র থেকে ধরা হয়।

টেবিল ১: বন্য বনাম চাষকৃত মাছের ফিড রেশিও (Fish In - Fish Out)

মাছের প্রজাতিপ্রয়োজন ১ কেজি ওজনের জন্য বন্য মাছ (গড়)পরিবেশগত প্রভাব
স্যামন (Salmon)৫ কেজিউচ্চ মাত্রায় খাদ্যশৃঙ্খল লুণ্ঠন
ভেটকি/বারামুন্ডি৩.৫ কেজিসামুদ্রিক জীববৈচিত্র্য হ্রাস
তেলাপিয়া১.২ কেজিতুলনামূলক কম, তবে ক্ষতিকর
চিংড়ি২.৫ কেজিম্যানগ্রোভ ধ্বংসের কারণ

এই তথাকথিত 'প্রোটিন কনভার্সন' প্রক্রিয়াটি চরম অপচয়কারী। মানুষ সরাসরি ছোট মাছ না খেয়ে তা বড় চাষের মাছকে খাওয়াচ্ছে, যা শেষ পর্যন্ত পুষ্টির অপচয় ঘটাচ্ছে।

Environmental programmatic statement for intensive livestock management on national resource lands (IA environmentalprounit) Environmental programmatic statement for intensive livestock management on national resource lands (IA environmentalprounit) — Wikimedia Commons · United States. Bureau of Land Management. Division of Range · Public domain

অ্যান্টিবায়োটিকের যথেচ্ছ ব্যবহার এবং জনস্বাস্থ্য ঝুঁকি

মাছের আইরিশ বা পাঙ্গাশের বিশাল ঘেরগুলোতে যখন হাজার হাজার মাছ গাদাগাদি করে থাকে, তখন সেখানে দ্রুত রোগ ছড়িয়ে পড়ে। এই রোগ নিয়ন্ত্রণ করতে চাষীরা জলে টনের পর টন অ্যান্টিবায়োটিক মিশিয়ে দেন।

১. জলদূষণ: খামারের উদ্বৃত্ত অ্যান্টিবায়োটিক এবং বর্জ্য পার্শ্ববর্তী জলাভূমি ও নদীতে গিয়ে মেশে। ২. সুপারবাগ: এই প্রক্রিয়ায় এমন কিছু ব্যাকটেরিয়া তৈরি হচ্ছে যা মানুষের জন্য ব্যবহৃত সাধারণ অ্যান্টিবায়োটিকের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলছে। ৩. ইউট্রোফিকেশন: মাছের বর্জ্য থেকে সৃষ্ট নাইট্রোজেন জলে শ্যাওলার আধিক্য ঘটায়, যা জলের অক্সিজেন শুষে নিয়ে অন্য জলজ প্রাণীদের শ্বাসরোধ করে মারে।

গত দুই দশকে বিশ্বের মাছ চাষের প্রবৃদ্ধি(মিলিয়ন টন)

পরিবেশগত প্রভাবের তুলনামূলক চিত্র

প্রভাবের ক্ষেত্রনিবিড় অ্যাকুয়াকালচার (Intensive)উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্প (Plant-based)
গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনউচ্চ (মিথেন এবং পরিবহণ)নগণ্য
পানির ব্যবহারবিশাল (প্রতি কেজিতে হাজার লিটার)অত্যন্ত কম
অ্যান্টিবায়োটিক প্রয়োগবাধ্যতামূলক ও ঝুঁকিপূর্ণপ্রয়োজন নেই
জীববৈচিত্র্য রক্ষাহুমকিস্বরূপসহায়ক

বিকল্প কী? টেকসই আগামীর পথ

সমাধান কেবল মাছ খাওয়া কমিয়ে দিলেই হবে না, বরং আমাদের খাদ্যাভ্যাসে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে হবে। এখন ল্যাবে তৈরি মাছের প্রোটিন এবং শেওলা (Algae) থেকে তৈরি ওমেগা-৩ সাপ্লিমেন্ট সহজলভ্য হচ্ছে।

"উদ্ভিদ-ভিত্তিক সীফুড এখন আর ভবিষ্যৎ নয়, এটি বর্তমান। সমুদ্রের ওপর চাপ কমাতে আমাদের পাতে লিন্টিল, শিম এবং বিশেষায়িত ভেগান ফিশ অল্টারনেটিভ যোগ করার সময় এসেছে।"

প্রায়শই জিজ্ঞাসিত প্রশ্ন (FAQ)

১. চাষের মাছ কি বন্য মাছের চেয়ে বেশি নিরাপদ?

না। চাষের মাছে প্রায়ই উচ্চ মাত্রায় পিসিবি (PCB) এবং ডাইঅক্সিন নামক রাসায়নিক পাওয়া যায়, যা ঘেরের নোংরা পরিবেশ ও কৃত্রিম ফিড থেকে আসে।

২. মাছের চাষ কি গবাদি পশুর চেয়ে কম ক্ষতিকর?

যদিও গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে মাছের চাষ কিছু ক্ষেত্রে পশুর তুলনায় কম, কিন্তু এটি সরাসরি সামুদ্রিক বাস্তুসংস্থান এবং ম্যানগ্রোভ বনাঞ্চল ধ্বংসের জন্য দায়ী।

৩. ওমেগা-৩ এর জন্য কি মাছ খেতেই হবে?

একেবারেই না। মাছ আসলে ওমেগা-৩ তৈরি করে না, তারা এটি পায় সামুদ্রিক শৈবাল (Algae) থেকে। আমরা সরাসরি অ্যালগি সাপ্লিমেন্ট বা তিসি তেলের মাধ্যমে এই পুষ্টি গ্রহণ করতে পারি।

পরিশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে যে 'মাছে-ভাতে বাঙালি' স্লোগানটি যখন তৈরি হয়েছিল, তখন প্রাকৃতিক নদী-নালা ছিল প্রাচুর্যে ভরা। আজকের যান্ত্রিক এবং অমানবিক অ্যাকুয়াকালচার সেই ঐতিহ্যের অংশ নয়। প্রাণিবৈচিত্র্য রক্ষা এবং একটি বাসযোগ্য পৃথিবীর জন্য মাছ চাষের এই বর্তমান কাঠামো রুখে দাঁড়ানো এখন সময়ের দাবি।

জলের স্তব্ধতা মানেই শান্তি নয়; বাণিজ্যিক খামারের কৃত্রিম পুকুরগুলো এখন কোটি কোটি অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণের আর্তনাদে ভারী।

সচরাচর জিজ্ঞাসা

মাছ কি সত্যিই ব্যথা পায়?
হ্যাঁ, আধুনিক স্নায়ুবিজ্ঞানীদের মতে মাছের জটিল স্নায়ুতন্ত্র এবং নোসিসেপ্টর রয়েছে যা তাদের তীব্র শারীরিক ও মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করতে সাহায্য করে।
মাছ চাষ কি পরিবেশের জন্য ভালো নয়?
মোটেও নয়। এটি জলদূষণ ঘটায়, স্থানীয় জীববৈচিত্র্য ধ্বংস করে এবং বন্য মাছের সংখ্যা কমিয়ে ফেলে।
নিরামিষ খাদ্যে কি সামুদ্রিক স্বাদ পাওয়া সম্ভব?
বর্তমানে সয়াবিন, মটরশুঁটি এবং বিভিন্ন সামুদ্রিক শৈবাল ব্যবহার করে চমৎকার উদ্ভিদ-ভিত্তিক বিকল্প তৈরি হচ্ছে যা স্বাদে ও পুষ্টিতে অনন্য।

সূত্র

  1. Oxford University: Fish Welfare and Environment
  2. FAO: The State of World Fisheries and Aquaculture
  3. ScienceDirect: Antibiotic use in Aquaculture